জাতীয়

সাশ্রয়ী ফিচার ফোন উৎপাদন করবে বাংলাদেশ, ১২ মাসে নিজস্ব এআই

দেশে শিগগিরই উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ফিচার ফোন সাশ্রয়ী মূল্যে উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। তিনি আরও জানিয়েছেন, আগামী ১২ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবস্থা থাকবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং চিপ ও মেমোরি ব্লক ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘এআই অ্যান্ড ইনোভেশন ডায়ালগ’ শীর্ষক এক সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।

২০২৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত ‘ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি’ সম্মেলনের তৃতীয় বিষয়ভিত্তিক অধিবেশন থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক সংলাপের এটি তৃতীয় আয়োজন। সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রযুক্তি-কূটনীতি ও সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার জাতীয় অগ্রাধিকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ও গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের প্রধান মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল কাজে লাগাতে সরকারের সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দেশের প্রথম তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি নীতি প্রণয়নে প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদানের কথাও স্মরণ করেন তিনি।

সম্মেলনে আলোচিত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ইসমাইল জবিউল্লাহ প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করার দিকনির্দেশনা দেন। বিশেষ করে সরকারি সেবার সব ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন আন্তঃকার্যক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বিশেষ অতিথি রেহান আসিফ আসাদ বলেন, জনগণের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। উন্নত ডিজিটাল যন্ত্রপাতি ও কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের বাস্তবমুখী নীতির ফলে বাংলাদেশ শিগগিরই সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ফিচার ফোন উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবনকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে সরকারের পরিকল্পনা এবং এ পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

রেহান আসিফ আসাদ আরও বলেন, উচ্চগতির ও নিরাপদ সংযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। আগামী ১২ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা থাকবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং চিপ ও মেমোরি ব্লক ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে।

অর্থনীতিতে জ্ঞানভিত্তিক কর্মীর গুরুত্ব

সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে ভিত্তি স্থাপিত তৈরি পোশাক খাত এবং প্রবাসী আয় দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির দুটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তিনি এ দুটিকে অর্থনীতির ডিএনএর ‘ডাবল হেলিক্স’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্ধারিত ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। সেটি হলো জ্ঞানভিত্তিক কর্মী।

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অর্থ বাংলাদেশ একা চলবে, তা নয়। বরং এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল করা এবং উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। দ্রুত প্রযুক্তি গ্রহণ করে তার সুফল কাজে লাগাতে সক্ষম একটি দেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তিনি।

প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্য

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।

প্রযুক্তিতে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তিনি বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং দেশের জনগণের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করছে এমন উদীয়মান খাতগুলোর ওপর নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনা হয়েছে।

প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপে সরকারি সহায়তা এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে নতুনভাবে সাজানোর বিষয়েও বক্তব্য দেন শামা ওবায়েদ ইসলাম।

সম্প্রতি সিলিকন ভ্যালি সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে সিলিকন ভ্যালির ব্যবধান কমানোর আহ্বান জানান। সরকারের অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নের অর্থ হলো, বাংলাদেশ শুধু প্রযুক্তির ক্রেতা হিসেবে থাকবে না, বরং প্রযুক্তির নিট সরবরাহকারী হয়ে উঠবে।

কোডার হিসেবে নিজের কাজের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে শামা ওবায়েদ ইসলাম প্রযুক্তির অপব্যবহার করে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় নিজস্ব সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি সেবাকে শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কার্যপ্রবাহের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত করতে হবে।

কৃষক থেকে নারী উদ্যোক্তা পর্যন্ত সমাজের সব স্তরের মানুষকে প্রযুক্তির সুফলের আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মানুষের জায়গা দখল করুক, তা তাঁরা চান না। বরং এসব প্রযুক্তি মানুষের সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বাড়াতে সহায়তা করবে, এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফলে ন্যায্য অংশীদার হতে চায় বাংলাদেশ

উদ্বোধনী বক্তব্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বলেন, বর্তমান সময়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং এর সুফল কারা পাবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ শুধু এ প্রযুক্তির ভোক্তা হতে চায় না, বরং এর সুফলের ন্যায়সংগত অংশীদার হতে চায়। বৈশ্বিক বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধনকারী হিসেবেও বাংলাদেশ ভূমিকা রাখবে।

সম্মেলনে ২৫টি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিদেশে বাংলাদেশের ৮৫টি কূটনৈতিক মিশন অনলাইনে যুক্ত হয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button